দালালমুক্ত ভূমি অফিসের অঙ্গীকার, এক বছরে ১,১৫০ শতাংশ খাস জমি উদ্ধার
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:
ভূমি সেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে সোনারগাঁয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও কাঁচপুর রাজস্ব সার্কেলের এসিল্যান্ড ফাইরুজ তাসনিম। দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক বছরে ভূমি ব্যবস্থাপনা, সরকারি খাস জমি উদ্ধার, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, মিসকেইস নিষ্পত্তি ও নামজারিসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি সোনারগাঁ ভূমি অফিস ও কাঁচপুর রাজস্ব সার্কেলকে দালালমুক্ত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকালে তাঁর কার্যালয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন এসিল্যান্ড ফাইরুজ তাসনিম।
মতবিনিময় সভায় ফাইরুজ তাসনিম বলেন, “ভূমি অফিসে সেবা নিতে এসে কোনো মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন কিংবা দালালের দ্বারস্থ হতে বাধ্য না হন—এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য। সাধারণ মানুষের জন্য আমার দরজা সবসময় খোলা।”
তিনি বলেন, ভূমি অফিসে একজন সাধারণ নাগরিক তাঁর প্রয়োজনীয় সেবা নিতে এসে যাতে সহজেই কাঙ্ক্ষিত সেবা পান, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, অনিয়ম কিংবা দালালের দৌরাত্ম্যের বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
এক বছরে উদ্ধার ১ হাজার ১৫০ শতাংশ খাস জমি
দায়িত্ব পালনের গত এক বছরের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে এসিল্যান্ড জানান, এ সময়ে সরকারি প্রায় ১ হাজার ১৫০ শতাংশ খাস জমি উদ্ধার করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ এ জমি প্রায় সাড়ে ১১ একরের সমপরিমাণ। সরকারি সম্পত্তি অবৈধ দখলমুক্ত করা এবং সরকারি ভূমি রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারি সম্পত্তি জনগণের সম্পদ। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অবৈধভাবে সরকারি জমি দখল করে রাখতে পারবে না। সরকারি জমি উদ্ধারে প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতেও অভিযান অব্যাহত থাকবে।
৪০ মোবাইল কোর্টে জরিমানা ৭ লাখ টাকার বেশি
গত এক বছরে ভূমি প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায় ৪০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৭ লাখ টাকার বেশি জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
ভূমি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সরকারি নির্দেশনা অমান্য, অবৈধ কার্যক্রম ও বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনের এ ধরনের অভিযান জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৪৩২ মিসকেইস নিষ্পত্তি, নামজারি প্রায় ১৫ হাজার
ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতেও গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান ফাইরুজ তাসনিম। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ৪৩২টি মিসকেইসের আদেশ ও নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
একই সময়ে প্রায় ১৫ হাজার নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে সেবা প্রদান, আবেদন নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানোর লক্ষ্যেই এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
দালালমুক্ত ভূমি অফিস গড়ার প্রত্যয়
মতবিনিময় সভায় ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্যের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসিল্যান্ড ফাইরুজ তাসনিম বলেন, সরকারি ভূমি সেবা পেতে কোনো নাগরিককে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের সহযোগিতা নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তিনি সেবাগ্রহীতাদের উদ্দেশে বলেন, নিজের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সরাসরি ভূমি অফিসে এসে সেবা নিতে হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা হয়রানির শিকার হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
সাংবাদিকদের সহযোগিতা চাইলেন এসিল্যান্ড
মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সাংবাদিকরা ভূমি অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রম, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি, দালালদের দৌরাত্ম্য, ভূমি সংক্রান্ত বিরোধসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জবাবে এসিল্যান্ড ফাইরুজ তাসনিম বলেন, ভূমি সেবাকে আরও সহজ, দ্রুত ও জনবান্ধব করতে প্রশাসনের পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো অনিয়ম বা সমস্যা সাংবাদিকদের নজরে এলে তা প্রশাসনকে জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “প্রশাসন ও গণমাধ্যম একসঙ্গে কাজ করলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। আমরা চাই মানুষ ভূমি অফিসে এসে সেবা নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরুক।”
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সাংবাদিকরা সরকারি খাস জমি উদ্ধার, অবৈধ দখল প্রতিরোধ, দ্রুত নামজারি নিষ্পত্তি এবং ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের চলমান কার্যক্রমকে স্বাগত জানান।
সোনারগাঁয়ের ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনবান্ধব পরিবেশ তৈরির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন উপস্থিত সাংবাদিক ও সেবাগ্রহীতারা।