

সোনারগাঁ প্রতিনিধি:
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ভূমি সেবায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এনে সাধারণ মানুষের আস্থা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনার পথে এগিয়ে যাচ্ছে কাঁচপুর রাজস্ব সার্কেল। দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক বছরে ভূমি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, সরকারি খাস জমি উদ্ধার, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, মিসকেস ও নামজারি আবেদন নিষ্পত্তিসহ নানা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কাঁচপুর রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফাইরুজ তাসনিম।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) নিজ কার্যালয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক সাক্ষাৎকারে গত এক বছরের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও জনসেবামূলক কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরেন তিনি। এ সময় ভূমি সেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি)।
ফাইরুজ তাসনিম বলেন, “ভূমি অফিসে সেবা নিতে এসে কোনো সাধারণ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন এবং দালালের দ্বারস্থ হতে বাধ্য না হন—এটাই আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। একজন নাগরিক তাঁর প্রয়োজনীয় সেবা আইন ও বিধি অনুযায়ী সহজেই পাবেন, সেটি নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।”
তিনি জানান, দায়িত্ব পালনের গত এক বছরে প্রায় ১ হাজার ১৫০ শতাংশ সরকারি খাস জমি উদ্ধার করা হয়েছে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষা এবং অবৈধ দখল প্রতিরোধে নিয়মিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
গত এক বছরে কাঁচপুর রাজস্ব সার্কেলের উদ্যোগে ৪১টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ১৩ লাখ টাকার বেশি জরিমানা আদায় করা হয়েছে। ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও সরকারি বিধিবিধান লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতেও কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
ভূমি সেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ নামজারি ও মিসকেস নিষ্পত্তিতেও গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এ সময়ে ৪৩২টি মিসকেস এবং প্রায় ১৫ হাজার নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। দ্রুততা, স্বচ্ছতা ও আইনানুগ প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিয়ে এসব আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে জানান সহকারী কমিশনার (ভূমি)।
তিনি আরও বলেন, ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দালালচক্রের যাতে কোনো ধরনের যোগাযোগ বা প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক নজরদারি করা হচ্ছে। সোনারগাঁ ভূমি অফিস ও কাঁচপুর রাজস্ব সার্কেলকে পুরোপুরি দালালমুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
এর আগে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নামজারি করার অভিযোগে একটি নিয়মিত মামলাও দায়ের করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ভূমি সংক্রান্ত জালিয়াতি, প্রতারণা কিংবা অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও স্পষ্ট করেন ফাইরুজ তাসনিম।
সেবাগ্রহীতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোনো নাগরিক ভূমি অফিসে এসে সমস্যার সম্মুখীন হলে সরাসরি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। সাধারণ মানুষের সমস্যা ও অভিযোগ শুনতে তাঁর কার্যালয়ের দরজা সবসময় খোলা থাকবে। সেবা নিতে গিয়ে কেউ হয়রানি বা অনৈতিক দাবির মুখোমুখি হলে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
সাক্ষাৎকারে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশংসা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি)। তিনি বলেন, ভূমি সেবার ইতিবাচক পরিবর্তন, অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা এবং জনগণের সমস্যা প্রশাসনের নজরে আনতে সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে সাংবাদিকরা প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ভূমি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, দালালের দৌরাত্ম্য এবং জটিলতার অভিযোগ কমিয়ে আনতে প্রশাসনের এমন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি খাস জমি উদ্ধার, অনিয়মের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট, দ্রুত নামজারি ও মিসকেস নিষ্পত্তির পাশাপাশি দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে সোনারগাঁয়ের ভূমি সেবায় আরও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তারা মনে করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভূমি সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে প্রশাসনের সদিচ্ছার পাশাপাশি সেবাগ্রহীতাদের সচেতনতা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। আর সেই সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কাঁচপুর রাজস্ব সার্কেল একটি আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব ভূমি সেবা ব্যবস্থার উদাহরণ তৈরি করতে পারে।